বৃহস্পতিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০১৯

দ্বৈত অনুভূতি



দ্বৈত অনুভূতি
- যাযাবর জীবন


আকাশ দেখেছিস?
নীল আকাশ,
সাদা সাদা মেঘ ছড়ানো;
সাগর দেখেছিস?
নীল সাগর, দ্বৈত নীলে রাঙানো;

তুই আকাশে ভালোবাসা খুঁজিস
আমি খুঁজি নীল
তুই সাগরে তীর খুঁজিস
আমি দেখি নীল,
ওটা দৃষ্টিভ্রম নয় রে দৃষ্টিভঙ্গি
আমি তোতে মানুষ দেখি
তুই আমাতে খুঁজিস সঙ্গী;

ভালোবাসিস?
অনেক বুঝি?
তবে কাঁদিস কেন?
কেনই থাকিস দূরে?

তুই আকাশে চেয়ে থাকিস,
তুই সাগর দেখিস,
আমি পাখি নই, যাব তোর কাছে উড়ে
নই মাছ, ভাসব সাগর তীরে,
ভালোবাসিস?
তবে কাছে আয়
থাকিস কেন দূরে?

আমরা দ্বৈত জীবনে বাস করি দ্বৈত ভালোবাসায়
দ্বৈত মনের দ্বৈত অনুভূতি আমাদের দ্বৈত স্বত্বায়
তোর ভালোবাসা মন খুলে খুলে
আমার ভালোবাসা মনের কেওড় মেলে,
তোর খোলা মনে ঢোকা হয় না আমার
আমার খোলা দরজায় তোর
তুই রাত চেয়ে চেয়ে দিন
আমার নিদ্রাহীন চোখে ভোর,
কোথায় জানি ফারাক দুজনার চাহিদায়
মনে অনেক ক্ষোভ জমে থাকে তোর;

একদিন পুঞ্জিভূত ক্ষোভে ঘৃণা জ্বলবে
অপেক্ষার রাত হবে না ভোর
দ্বৈত ভালোবাসা আর দ্বৈত ঘৃণায়
দূরত্ব বাড়বে আমার সাথে তোর;

যেদিন তোর তীব্র ভালোবাসা তীব্র ঘৃণায় পরিণত হবে
সেদিন দূর থেকে বুঝতে পারবি,
"অনেক ভালোবেসেছিলাম তোকে"

সেদিন আবার দ্বৈত ভালোবাসা আর দ্বৈত ঘৃণায়
ভাসিস, ডুবিস না
কান্নায় থেকে থেকে।



আবেগানুভূতি



আবেগানুভূতি
- যাযাবর জীবন


কিছু হাসি হাসি কান্না কিছু কান্না কান্না হাসি
কিছু সুখ সুখ অনুভব আর কিছু দুঃখ দুঃখ অনুভূতি
কিছু সত্য সত্য মিথ্যা আর কিছু মিথ্যা মিথ্যা সত্য
অনুভবের মিশ্রণ, অনুভবের অনুভূতি
মানুষের মাঝে অনুভব, মানুষেরই অনুভূতি;

কেও কেও তোমরা আবেগপ্রবণ যখনই আকাশে মেঘের আগমন
কারো কারো আবার কাব্যে মাতম বৃষ্টি যখন ঝুমা ঝুমঝুম

আমার কাছে মেঘ মানেই মনখারাপ
আর বৃষ্টি মানে কান্নার ধুম;

কেও কেও তোমরা কবিতা লিখ আকাশে যখন জ্যোৎস্না হাসে
কারো কারো মনে ভাবের উদয় চাঁদ উঠলেই ভালোবাসে

আমার কাছে চাঁদনি মানেই মনখারাপ
আমার ঘরে চাঁদ উঠলেই রাত্রি আসে;

আমি মানুষের হাসিই বুঝি না
কান্না পড়ব কি?

অনুভূতি আমার কাছে রাত রাত অনুভব
যখন মানুষের মুখে অনর্থক হাসি দেখি,
শুধু বারবার মনে হয়,
আরে, আরে! অকারণ হাসছে কেন?
এর উদ্দেশ্যটা কি?

মানুষের মাঝে মিশ্র অনুভব মানুষেরই মিশ্র অনুভূতি
আমার পাথর চোখ, পাথর মন
কোথায় আবেগ? কোথায় অনুভূতি?




চোখ কথা বলে



চোখ কথা বলে
- যাযাবর জীবন


চোখ বলে
চোখ কথা বলে

তার চোখ জুড়ে মায়া
আমার লবণ সহ্য হয় না ;

কেও কেও দুর্বোধ্য ভাষায় কান্না আঁকে
ভালোবাসা কাঁদায় কাওকে মধ্য রাতে

অনেক দিন হাসে নি সে
শুধুই কেঁদেছে না বুঝে ভালোবেসে

লবণে অরুচি আমার
আমি তার চোখ দেখি না

আজ কান্না মুছবো না আমি তার
আমারও অভিমান আছে,
কেন বোঝে নি সে ভালোবাসা আমার?

একদিন, কোন একদিন
ভালোবাসা বুঝবে সে
আমি থাকি আর না থাকি
আকাশ পাতাল আমায় খুঁজবে সে

তারপর?

আমায় খুঁজে না পেলে মন লবণ নদী
আর চোখ কান্না সাগর,
তার ও আমার;

আর খুঁজে পেলে?

আমি রাত হব সে জ্যোৎস্না
আমি ঘুম হব সে স্বপ্ন
যেদিন সে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পরবে আমার বুকে
কান্না মুছে যাবে তার চোখ থেকে;

আমি প্রহর গুনছি,
হয় আমি রাত্রি হব
আর নয়তো হবে তার ভোর।











কবিতা হ




কবিতা হ
- যাযাবর জীবন


কাগজে কলম হিবিজিবি আঁক দিতেই
এক একজন এক এক ভাবে চেয়ে থাকে,
কাগজের দিকে;

গল্প-পোকা নতুন কোন গল্পের খোঁজে
ছবি-বোদ্ধার চোখে দুর্বোধ্য কোন ছবির বিমূর্ত মুগ্ধতা ফুটে ওঠে
কবিতা প্রেমী মেতে ওঠে অবোধ্য আঁকের নতুন এক কাব্যরসে;

কেও কেও আবার ভুরু কুঁচকে চেয়ে থাকে
কেও কেও বক্র হাসি হাসে
শ্লেষ্মার কটূক্তি শোনা যায় কারো কারো মুখে
কোথা থেকে জানি ঈর্ষাপোকা পোড়া গন্ধ ভেসে আসে;

আমি আঁকতে জানি না
লিখতে জানি না,
কখনো দাগ কাটে নি কেও আমার অনুভূতিতে;
তবুও মাঝে মাঝে কাটাকুটি খেলাতে যখনই কাগজে কলম ঘুরাই
তখনই খাতায় তোর জিজ্ঞাসার উঁকি,

আমাকে নিয়ে কবিতা লিখছ নাকি?

আমি সূর্য ভেঙে যাই খাদ্যাহ্নেষণে
প্রেমের খোঁজে তুই আমায় ভেঙে ভেঙে
আমি রাত ভেঙে যাই অমাবস্যা হাতে
তুই ভালোবাসা খুঁজিস মরা জ্যোৎস্নাতে;

অনেক ভালোবাসিস বুঝি?

তবে কবিতা হ
আমার কলমে।





জীবনের নানা অধ্যায়



জীবনের নানা অধ্যায়
- যাযাবর জীবন


এক একটা সময়ের এক এক অনুভব
জীবনের অধ্যায়গুলো কখনো সরব কখনো নীরব;

একটা সময় জীবন মানেই বাবা-মা
একটা সময় বন্ধু-বান্ধব
একটা সময় যৌবনের আগমন
একটা সময় বিপরীত লিঙ্গে আকর্ষণ
একটা সময় শুধুই যৌবনের
নিয়ন্ত্রণহীন বল্গাহরিণের
একটা সময় ভালোবাসার
একটা সময় চোখ স্বপ্ন
একটা সময় তাকে ছাড়া সব ফাঁকা
একটা সময় কঠিন জীবন
জীবন মানেই টাকা টাকা
একটা সময় থিতু হওয়ার
একটা সময় ঘর সংসার
একটা সময় সবাই আপন
স্বার্থ এলেই খুব দুশমন
একটা সময় সবাই পর
যেতেই হয় রে মাটির ঘর;

আমি জীবন দেখেছি,
পাহাড় থেকে মরুভূমি হয়ে সাগর
ঝর্না থেকে গড়িয়ে লোনা জল
দিনের নিচে চাপা পড়া রাত
সাদার সাথে অমাবস্যা মেলানো কালো
সুখ সুখ চেহারায় বুকচেরা কান্না
আরও কত কি?

তোমরা যাকে জীবন বলো
আমি বলি স্বপ্ন
এক সময় ঘুম থেকে জেগে দেখব
শুয়ে আছি সাড়ে তিন হাত ঘরে;

তারপর?
আবার একটা নতুন জীবন শুরু হবে?

আচ্ছা! কি দেখব ওখানে?
কেও থাকবে কি পাশে?
সেখানে অন্ধকার থাকবে নাকি আলো?
বাবা, মা, ভাই, বোন?
স্ত্রী সন্তান পরিজন?

এই যে এত এত ভালোবাসা
এত এত অনুভব,
কাকে বলব সেখানে?

কত কত প্রশ্নই না ক্রমাগত মাথায় ঘোরে,
কি আছে আর কি নেই সেখানে?
খুব জানতে ইচ্ছে করে;

অনেকগুলো সময় পারি দিয়ে এসেছি
এবার যেতে হবে মাটির ঘর।






হিংসার রাত




হিংসার রাত
- যাযাবর জীবন


কুয়াশায় ভিজছে অন্ধকার রাত
তুই পা রাখতেই আলোকিত ছাদ;

তুই চাঁদে ভিজছিস ছাদে
আমি ভিজে যাচ্ছি হিংসায়;

কুয়াশা ছুঁয়ে যাচ্ছে তোকে
ছুঁয়ে দিচ্ছে রাত
ছুঁয়ে দিচ্ছে চাঁদনি
ছুঁয়ে যাচ্ছে চাঁদ
হিংসে তোকে কুয়াশা
হিংসে তোকে চাঁদ
হিংসে তোকে চাঁদনি
হিংসে তোকে ছাদ;

ওম ওম ভালোবাসায়
সবাই ছুঁয়ে আছে তোকে
ফাটা ফাটা ঠোঁট আমার শীতার্ত রাতে
আর মন পুড়ছে হিংসায়।











বুধবার, ৯ জানুয়ারি, ২০১৯

এক নিশিকন্যার সাথে স্বপ্ন আলাপন



এক নিশিকন্যার সাথে স্বপ্ন আলাপন
- যাযাবর জীবন


সে রাতটা ছিল অন্যরকম
এক নিশিকন্যার সাথে স্বপ্ন আলাপন

শীতের রাত
অফিসে বেশ খানিকটা রাত হয়ে গিয়েছিল কাজে
রাস্তাটা ঢেকেছিল ঘন কুয়াশার সাজে

অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরও কোন রিক্সা না পেয়ে
অগত্য পথ হাঁটা,
বেশ খানিকটা এগোনোর পর গলিপথ থেকে শীর্ণ এক যুবতী
বেরিয়ে এসে পা মেলালও পথের সাথে
স্যার কি একা?

একটু চমকে তাকালাম
বুঝে গেলাম নিশিকন্যা,

বেশ মজাই পেলাম
উত্তর দিলাম
হ্যাঁ, গো মা;

সম্ভাষণে একটু চমকে গেল বোধহয়
মুহূর্তে সামলে নিলো
স্যার যে কি বলেন!
আজ কোন রোজগার হয় নি,
আমার ঘর আছে
কিছু সময় কিনতে চাইলে চলেন;

বড্ড রাগ হলো
এবার ভালো করে তাকালাম
জীর্ণ শীর্ণ কাপড়
কৈশোর পার হয়ে মাত্র যৌবনে পা দিয়েছে হয়তো
এ বয়সেই?
কি জানি!
পরিস্থিতি? পেটের দায় নয়তো!

পকেট হাতড়ে দেখলাম মাত্র একশ টাকা দুটি আর কিছু খুচরা নোট
দুশো টাকা বাড়িয়ে দিয়ে বললাম
এটা রাখ, আমার কাছে আর নাই
থমকে দাঁড়িয়ে বলল,
ভিক্ষা করি না স্যার
শরীর বেচি, ভাত খাই;

এবার থমকানোর পালা আমার
আসলে চমকালাম,
মনে মনে বললাম
বাহ! বেশ তো!
আমার কাজের বিনিময়ে খাদ্য
নিশিকন্যার কামের,
সে শরীর বেঁচে
আমি শ্রম,
ধ্যাত!
কি সব উল্টোপাল্টা ভাবছি!
মনের ভ্রম;

আমি চুপ করে আমার পথে হাঁটা ধরলাম
লক্ষ্য করলাম সেও আসছে পেছন পেছন
এবার দাঁড়িয়ে পড়ে বললাম
টাকা নাও, পিছু ছাড়
সে হেসে দিয়ে বলল
ভয় পাবেন না স্যার
এ রাস্তাটা বড্ড ফাঁকা
আমি ঐ সামনের মোড়টা পর্যন্ত যাব
আপনার সাথে
একটু ভয় ভয় লাগে এ রাস্তায় একা;

হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞাসা করলাম
বাড়িতে কে আছে তোমার?
উত্তর দিলো
ভাঙা চৌকি, মাটির উনুন
দুটো হাড়ি, একটা প্লেট
একটা গ্লাস
আর পেটে রাজ্যের ক্ষুধা;

বাবা-মা, ভাই-বোন?
হেসে উত্তর দিল
তারা তো কবেই দিয়েছে আমায় বিসর্জন!

বড্ড মন খারাপ হলো
বড় রাস্তার মোড়ে চলে এসেছি
রিক্সা পেয়ে উঠে বসলাম
আবার টাকা সাধলাম, নিলো না;
পেছন থেকে বললো
সাবধানে যাবেন স্যার
ভালো থাকবেন;

এগিয়ে চলছে রিক্সার চাকা
কুয়াশার রাত
রাস্তাঘাট বড্ড ফাঁকা;

অনেক রাতে বাড়ি ফিরলাম
খাওয়া দাওয়া করে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ঘুম;

.....................

হঠাত দেখলাম
চাঁদের রাত
বিশাল ফাঁকা মাঠে একটা বেঞ্চ
আমি বেঞ্চে বসা
সামনে মাটিতে বসা, নিশিকন্যা ;

স্বপ্নে স্বপ্নে দুজনার কথোপকথন -

নিশিকন্যা! তুমি স্বপ্ন দেখ?

বাবু! লাল পানির নেশায় রঙিন স্বপ্ন দেখা তোমাদের অধিকার
আমি শুধু দেখি প্রতিদিন নতুন নতুন খরিদ্দার;

প্রেম হয় নি কখনো কারো সাথে?

না গো বাবু,
প্রেম তো মনের
প্রেম শুধু তোমাদের,
নিশিকন্যারা শরীরের
আমাদের কিছু হলে পেটে ক্ষুধা হয়, অনাকাঙ্ক্ষিত বাচ্চা হয়
আর খুব বেশী কিছু হলে, এইডস হয়;

কখনো ভালোবাসো নি কাওকে?

বেসেছি তো বাবু!
শরীর'কে
পেটকে
ক্ষুধাকে,
তোমরা আমাদের ভালোবেসে যাও আঁচড়ে আঁচড়ে, কামড়ে কামড়ে
আমরা শুধু পেট ভরাই, ক্ষুধা ভালোবেসে;

ধ্যাত! আমি সব ভালো ভালো কথা জিজ্ঞাসা করছি
আর তোমার সব উল্টোপাল্টা উত্তর
ভালো করে কথা বলতেও পার না?
যাও তোমার সাথে আর কথাই বলব না;

নিশিকন্যা হেসে উত্তর দেয়
প্রেম?
ভালোবাসা?
না গো বাবু, না!
ওসব আমাদের থাকে না
ওসব আমাদের থাকতে হয় না,

আমার কি আছে জানো?

আমার আছে একটি পেট, আর একরাশ ক্ষুধা
পুরুষের লালসা দেখার দুটি চোখ
তাদের শীৎকার আর অশ্রাব্য গালি শোনার দুটি কান
বোবা তিনটি মুখ
আর দুটি স্তন

এইটুকু নিয়েই নিশিকন্যাদের জীবন;

আচ্ছা বাবু, আমি গেলাম, তুমি ঘুমাও
বলে সে বিদায় নিলো;

তারপর আমিও ঘুমিয়ে গেলাম রাতের কোলে,
স্বপ্নগুলো বড্ড অদ্ভুত, তাই না!