বুধবার, ৯ জানুয়ারি, ২০১৯

এক নিশিকন্যার সাথে স্বপ্ন আলাপন



এক নিশিকন্যার সাথে স্বপ্ন আলাপন
- যাযাবর জীবন


সে রাতটা ছিল অন্যরকম
এক নিশিকন্যার সাথে স্বপ্ন আলাপন

শীতের রাত
অফিসে বেশ খানিকটা রাত হয়ে গিয়েছিল কাজে
রাস্তাটা ঢেকেছিল ঘন কুয়াশার সাজে

অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরও কোন রিক্সা না পেয়ে
অগত্য পথ হাঁটা,
বেশ খানিকটা এগোনোর পর গলিপথ থেকে শীর্ণ এক যুবতী
বেরিয়ে এসে পা মেলালও পথের সাথে
স্যার কি একা?

একটু চমকে তাকালাম
বুঝে গেলাম নিশিকন্যা,

বেশ মজাই পেলাম
উত্তর দিলাম
হ্যাঁ, গো মা;

সম্ভাষণে একটু চমকে গেল বোধহয়
মুহূর্তে সামলে নিলো
স্যার যে কি বলেন!
আজ কোন রোজগার হয় নি,
আমার ঘর আছে
কিছু সময় কিনতে চাইলে চলেন;

বড্ড রাগ হলো
এবার ভালো করে তাকালাম
জীর্ণ শীর্ণ কাপড়
কৈশোর পার হয়ে মাত্র যৌবনে পা দিয়েছে হয়তো
এ বয়সেই?
কি জানি!
পরিস্থিতি? পেটের দায় নয়তো!

পকেট হাতড়ে দেখলাম মাত্র একশ টাকা দুটি আর কিছু খুচরা নোট
দুশো টাকা বাড়িয়ে দিয়ে বললাম
এটা রাখ, আমার কাছে আর নাই
থমকে দাঁড়িয়ে বলল,
ভিক্ষা করি না স্যার
শরীর বেচি, ভাত খাই;

এবার থমকানোর পালা আমার
আসলে চমকালাম,
মনে মনে বললাম
বাহ! বেশ তো!
আমার কাজের বিনিময়ে খাদ্য
নিশিকন্যার কামের,
সে শরীর বেঁচে
আমি শ্রম,
ধ্যাত!
কি সব উল্টোপাল্টা ভাবছি!
মনের ভ্রম;

আমি চুপ করে আমার পথে হাঁটা ধরলাম
লক্ষ্য করলাম সেও আসছে পেছন পেছন
এবার দাঁড়িয়ে পড়ে বললাম
টাকা নাও, পিছু ছাড়
সে হেসে দিয়ে বলল
ভয় পাবেন না স্যার
এ রাস্তাটা বড্ড ফাঁকা
আমি ঐ সামনের মোড়টা পর্যন্ত যাব
আপনার সাথে
একটু ভয় ভয় লাগে এ রাস্তায় একা;

হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞাসা করলাম
বাড়িতে কে আছে তোমার?
উত্তর দিলো
ভাঙা চৌকি, মাটির উনুন
দুটো হাড়ি, একটা প্লেট
একটা গ্লাস
আর পেটে রাজ্যের ক্ষুধা;

বাবা-মা, ভাই-বোন?
হেসে উত্তর দিল
তারা তো কবেই দিয়েছে আমায় বিসর্জন!

বড্ড মন খারাপ হলো
বড় রাস্তার মোড়ে চলে এসেছি
রিক্সা পেয়ে উঠে বসলাম
আবার টাকা সাধলাম, নিলো না;
পেছন থেকে বললো
সাবধানে যাবেন স্যার
ভালো থাকবেন;

এগিয়ে চলছে রিক্সার চাকা
কুয়াশার রাত
রাস্তাঘাট বড্ড ফাঁকা;

অনেক রাতে বাড়ি ফিরলাম
খাওয়া দাওয়া করে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ঘুম;

.....................

হঠাত দেখলাম
চাঁদের রাত
বিশাল ফাঁকা মাঠে একটা বেঞ্চ
আমি বেঞ্চে বসা
সামনে মাটিতে বসা, নিশিকন্যা ;

স্বপ্নে স্বপ্নে দুজনার কথোপকথন -

নিশিকন্যা! তুমি স্বপ্ন দেখ?

বাবু! লাল পানির নেশায় রঙিন স্বপ্ন দেখা তোমাদের অধিকার
আমি শুধু দেখি প্রতিদিন নতুন নতুন খরিদ্দার;

প্রেম হয় নি কখনো কারো সাথে?

না গো বাবু,
প্রেম তো মনের
প্রেম শুধু তোমাদের,
নিশিকন্যারা শরীরের
আমাদের কিছু হলে পেটে ক্ষুধা হয়, অনাকাঙ্ক্ষিত বাচ্চা হয়
আর খুব বেশী কিছু হলে, এইডস হয়;

কখনো ভালোবাসো নি কাওকে?

বেসেছি তো বাবু!
শরীর'কে
পেটকে
ক্ষুধাকে,
তোমরা আমাদের ভালোবেসে যাও আঁচড়ে আঁচড়ে, কামড়ে কামড়ে
আমরা শুধু পেট ভরাই, ক্ষুধা ভালোবেসে;

ধ্যাত! আমি সব ভালো ভালো কথা জিজ্ঞাসা করছি
আর তোমার সব উল্টোপাল্টা উত্তর
ভালো করে কথা বলতেও পার না?
যাও তোমার সাথে আর কথাই বলব না;

নিশিকন্যা হেসে উত্তর দেয়
প্রেম?
ভালোবাসা?
না গো বাবু, না!
ওসব আমাদের থাকে না
ওসব আমাদের থাকতে হয় না,

আমার কি আছে জানো?

আমার আছে একটি পেট, আর একরাশ ক্ষুধা
পুরুষের লালসা দেখার দুটি চোখ
তাদের শীৎকার আর অশ্রাব্য গালি শোনার দুটি কান
বোবা তিনটি মুখ
আর দুটি স্তন

এইটুকু নিয়েই নিশিকন্যাদের জীবন;

আচ্ছা বাবু, আমি গেলাম, তুমি ঘুমাও
বলে সে বিদায় নিলো;

তারপর আমিও ঘুমিয়ে গেলাম রাতের কোলে,
স্বপ্নগুলো বড্ড অদ্ভুত, তাই না!













চরম বোকা


চরম বোকা
- যাযাবর জীবন


বুদ্ধিমান মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকে
বোকারা টাকার পেছনে ছুটে

আমি চরম বোকা হয়ে রইলাম
কিছু ছেড়া কাগজ হাতে!



সোমবার, ৭ জানুয়ারি, ২০১৯

সাদাকালো গল্প




সাদাকালো গল্প
- যাযাবর জীবন


প্রতিটা জীবনেরই কিছু গল্প আছে
প্রতিটা জীবনই গদ্যময়,
জীবনের গল্পগুলো মোটামুটি একই রকমের
কিছু সাদাকালো আর কিছু রংধনু মেশানো;

একটা পুরো জীবন সাদা হতে পারে না
পারে না পুরোপুরি অন্ধকার হতে;

ওখানে কখনো নীল খেলা করে কখনো মেঘ ওড়ে ঘুরে
কখনো কাঠফাটা রোদ তো কখনো ঝুমঝুমান্তি বৃষ্টি
কখনো বা রোদবৃষ্টির লুকোচুরি খেলায় রংধনু রঙে একাকার

জীবন কখনো লাল ভোর, কখনো মেঘলা দুপুর আর কখনো বিষণ্ণ বিকেল
কখনো কর্মব্যস্ত দিন তো কখনো মন-উদাস জ্যোৎস্নার রাত
কখনো চাঁদ, কখনো অমাবস্যা, কখনো বা মনখারাপের অন্ধকার

কেও কেও জীবনের গল্প বলে হালকা হয়
কেও কেও নীল গল্পগুলো চেপে রাখে নিজের মাঝে
কারো কারো জীবন খটমটে প্রবন্ধ তো কারো গদ্যময়
কারো কারো জীবন গানে গানে আর কারো জীবনে কবিতা কথা কয়

আমি তোর জীবনের সবগুলো গল্প জানি
থাকুক না আমার নীল গল্পগুলো কালো অমাবস্যায়!

তুই দিন তো
আমি আঁধার

তুই প্রতিদিন নতুন সূর্যের গল্প শোনাবি
আমি কবিতায় এঁকে যাব অন্ধকার

অন্ধকার পড়ার ক্ষমতা আছে ক'জনার?








স্বপ্ন রাত



স্বপ্ন রাত
- যাযাবর জীবন


তুই, আমি আর একটা রাত
মুখোমুখি বসে ছিলাম আমরা আর ছিল হাতে হাত

মনটা ছিল তরল
চোখ একটু ঘোলাটে বাষ্প বাষ্প
ঠোঁট আগানো ছিলো ঠোঁটে,

ঠোঁটে ঠোঁট রাখতেই চোখ বন্ধ হয়েছিল দুজনার;

চোখে চোখ রেখেছিলি কি?
কি জানি!
না তুই কিছু দেখছিলি
না আমি
শুধু শরীরে শরীর মিলেমিশে একাকার;

সে রাতটা ছিল নিঃসঙ্গ একা আর চারিদিক বড্ড আঁধার আঁধার,
তুই ছিলি চাঁদ
মন ছিল চাঁদনি
আর দুজনার ভালোবাসার হাহাকার;

কিছু কিছু রাত স্বপ্ন স্বপ্ন
কিছু কিছু রাত কল্পনা
অল্প কিছু রাত ভালোবাসা
কিছু কিছু রাতে তুই আমার
একটি দুটি রাতে আমি তোর
আর বছরের বাকি রাতগুলো অনুভবে একাকার;

থাকুক না একটি দুটি রাত স্বপ্ন হয়ে!
শুধু তোর আর আমার।









কিছু কিছু রাত



কিছু কিছু রাত
- যাযাবর জীবন


কিছু কিছু রাত অন্য রকম
কিছু কিছু রাত চাঁদের মতন
কিছু কিছু রাত শুধুই তোর
কিছু কিছু রাত শুধুই আমার
আর কিছু কিছু রাত আমাদের দুজনার;

তোর একার রাতগুলো স্মৃতি পড়ার
আমার একার রাতগুলোর মন খারাপ
দুজনার রাতগুলো ভালোবাসার;

একদিন এখানে কোন এক রাতে
দোল খেয়েছিলাম ঝুল বারান্দায়
তুই আমি দুজনে
হাতে হাত রেখে,
আজ ওখানে দোলনাটা ঝুলছে একা
দোলনাটার কি মন খারাপ?
নাকি শূন্যতা শুধুই তোর একার?

আমার পাথর মন
কান্নার শ্যাওলা জমে না অনুভূতির কোথাও;

সেই রাতটার কথা মনে আছে?
কিছু সুখ সুখ অনুভব
কিছু দু:খ দু:খ অনুভূতি
কিছু কষ্ট কষ্ট সুখ
আর মূহুর্তে উড়ে যাওয়া সময়;

সময়কে ধরে রাখতে পেরেছে কে, কবে?
জীবন শুধুই স্মৃতির বলয়;

একদিন
কোন একদিন
থাকব না আমি
রয়ে যাবে কিছু স্মৃতি
আর তোর কান্না কান্না অনুভূতি;

কাঁদিস না কিন্তু সে রাতে
যখনই ছুঁয়ে যাবে তোকে
আমার স্মৃতির অনুভব
আর আমি মাটির ঘরে শব।


অল্প



অল্প
- যাযাবর জীবন


একদিন অনেক রাতে
তুই আর আমি,
হাতে হাত ছিল
চোখে চোখ
মনে মন রাখতে গিয়েই চোখ লবণ,
কিছু না বলা কথা ছিল
কিছু অনুভব
অনেকটা ভালোবাসা
আর বেশ খানিকটা নিস্তব্ধ রাতের প্রহর;

সুখ আর কতক্ষণের বল?
তারপর বিচ্ছিন্নতা
আর বাকি রাত দু:খ দু:খ অনুভব;

তুই, আমি
দিন, রাত
আর চাঁদ, সূর্য মিলেই
আমাদের ভালোবাসার গল্প,
কখনো দু:খ কখনো বেদনা
কখনো হাসি কখনো কান্না
অনেক অনেক ভালোবাসা,
আর সুখের সময়গুলো বড্ড অল্প।



উপহার



উপহার
- যাযাবর জীবন


কতজন কত দামী দামী উপহারই না দিয়েছে আমায়
বিভিন্ন পালা পর্বণে
আমার ঘরের আলমিরায় সাজানো আছে থরে থরে
কখনো সখনো একটি দুটির দিকে চোখ যায়
কখনো একটি দুটির দিকে মন;

ওখানে তোর দেয়া কোন উপহার সাজানো নেই,
কাঁচের আলমিরাতে;
কেন জানিস?
তোর দেয়া সব উপহারগুলো সাজানো আছে মনের ঘরে
থরে থরে;

আর তোর দেয়া সবচেয়ে দামী উপহারটা রেখে দিয়েছি
বুকের মধ্যেখানে, একান্ত নিজের করে;
জানিস সেটা কি?
তুই নিজে;

তুই নিজেই বুঝিসনি কখন নিজের অজান্তে
তোকেই দিয়ে দিয়েছিস আমায়!

আমি চুপে চুপে বের করে দেখি তোকে
মনঘর খুলে খুলে,
মন খারাপের প্রহরে প্রহরে;
তারপর আবার ঢেকে রেখে দেই তোকে
মনঘরে
খুব যতনে।